প্রকাশিত:
২৪ আগষ্ট ২০২৫, ১৫:২৪
মুন্সীগঞ্জ শ্রীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি (এসিল্যান্ড) অফিসে দীর্ঘ দিন ধরে সম্পূর্ন ইচ্ছাকৃত ঝামেলা সৃষ্টি করে জমিজমার নামজাারি জমাভাগ, মিস কেইস ও লীজ নবায়ন সংক্রান্ত নানা ধরনের কাজকে জটিল করে তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসের কানোনগো হাবিবুর রহমান ও সার্ভেয়ার মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভূক্তভোগী অনেকেই এ অভিযোগ করেন। খোজনিয়ে জানাযায়, বর্তমান সহকারী কমিশনার ভূমি গোলাম রাব্বানী সোহেল প্রায় তিন মাস যাবৎ শ্রীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি হিসেবে যোগদানের পর থেকে তার কাছে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার নামজারি কেস জমা পরলেও সমাধান হচ্ছে হাতে গোনা অল্প সংখ্যক। এতে করে প্রকৃত ভূমির মালিকেরা হয়রানির শিকারই হচ্ছেননা তাদের পকেট থেকে খসে যাচ্ছে মোটা অংকের টাকা।
১৯৮৪ সালের ১৮ জুলাই ভূমি প্রশাসন বোর্ডের জারি করা এক পরিপত্রে নামজারি প্রক্রিয়াকে বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম হিসেবে গন্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নামজারী জমা খারিজ ও একত্রিকরন কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহন ও প্রজাস্বত্ত আইনের ১৪৩ ধারার ক্ষমতা বলে রাজস্ব কর্মকর্তা (এসিল্যান্ড বা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট) ওই আইনের ১১৬ ও ১১৭ ধারার আওতায় গ্রহন করে পঞ্চদশ অধ্যায়ের বিভিন্ন ধারার আলোকে নিস্পত্তি করে থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী জমির নামজারি করার জন্য আবেদন পত্র জমা দেওয়ার পর একজন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহশিলদার) কিংবা উপ সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (সহকারী তহশিলদার) তা যাচই-বাচাই এবং তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য এসিল্যান্ড অফিসে পাঠান।
আবেদন পত্রের সঙ্গে থাকা জমির দলিল পত্র, রেকর্ড-পর্চা ও দখল ঠিক থাকলে নামজারী মামলা নিস্পত্তির জন্য সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) মঞ্জুর করে স্বাাক্ষর দেন। এ ক্ষেত্রে এসিল্যান্ড এর নামযুক্ত সিল মোহরের নিচে নামজারী সহকারীর স্বাক্ষরও তারিখ থাকবে। এরপর খাজনা পরিশোধ করে খারিজা পর্চা ও ডুপ্লিকেট কার্বন কপি (ডিসিআার) এর মাধ্যমে নামজারি শেষ করা হয়। এ ক্ষেত্রে সার্ভেয়ার ও কানুনগোর মতামতের কোন প্রয়োজন হয়না। ভূমি ব্যবস্থাপনা আইনে স্পষ্ট ভাবে বলা আছে, জমির নামজারি জমাখারিজ ও একত্রী করন (খতিয়ানের নাম অন্তভূক্তকরণ) মামলা তিন জন কর্মকর্তার টেবিল থেকেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ শ্রীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) ভুমি অফিসে ছয়জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর টেবিলে ফাইল চালাচালি করতে দেখা যায়। এটা ভূমি প্রশাসনের কর্ম পরিকল্পনার বিধির সম্পূর্ন পরিপহৃী বলে অনেকে মনে করেন।
উপজেলার কুকুটিয়া ইউনিয়নের ভূক্তভোগী হাবিব বলেন, আমার নামজারিটি না-মঞ্জুর হলে এসিল্যান্ড স্যারের নিকট যেয়ে জানতি পারি আমার এস.এ পর্চা সই মহূরী নাই। অথচ আমার আগের নামজারি করা ছিল। একই ইউনিয়নের ফালু শেখ বলেন, আমার দলিলে নাম ফালু শেখ এবং জাতিয় পরিচয় পত্রে শেখ ফালু। শেখ আগে থাকার কারনে আমার নামজারিটি না-মঞ্জুর করা হয়েছে। তন্তর ইইনয়নের সুন্ধার দিয়া গ্রামের আলী হোসেন ও নন্দীপাড়া গ্রামের কবির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, আমার নামজারি কেসনং ১৪/২৫-২৬ ও ৫৮০/২৫-২৬ যাহার শুনানির তারিখ ছিল ১৭/০৭/২০২৫ ইং তারিখ। আমরা স্বশরিরে শুনানিতে অংশ গ্রহন করে ঢাকা চলে যাই। প্রায় ২৩ দিন পরে জানতে পারি নামজারি কেসটি না-মঞ্জুর হয়েছে।
অবসর প্রাপ্ত বিডিআর নায়েব আসাদুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, আমি এসিল্যান্ড অফিসের সার্ভেয়ার মনিরুল ইসলামকে তিনটি নামজারি করতে দেই। প্রতিটি নামজারির জন্য ৫ হাজার টাকা করে তিনটি নামজারিতে ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন। আমি তাকে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দেই। এর পরও আমার দু’টি নামজারি না-মঞ্জুর করা হয়েছে। আমি শুনেছি নামজারি শুনানির দিন সার্ভেয়ার মনিরুল ২ হাজার টাকা করে নেন। এছারা তার আচার ব্যবহারও খুব একটা ভলো না।
পাটাভোগ ইউনয়নের আবু কালামসহ আরো প্রায় ১০/১২ জন ভূক্তভোগী বলেন, আমরা বাড়ির লীজ নবায়নের জন্য এক বছর আগে এসিল্যান্ড অফিসে কাগজের সাথে ২ হাজার টাকা জমা দিয়েছি। আজ পর্যন্ত আমরা লীজ নবায়নের কাগজ হাতে পাইনি। এসিল্যান্ড স্যারের কাছে জায়নি, তবে অন্যান্য অফিসারদের নিকট গেলে তারা বলেন, ফাইলটি খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের পূনরায় আবেদন কওে বলেচেন। এছারা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভূক্তভোগী জানায়, ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারির ফাইল নিয়ে গেলে প্রতিটি ফাইলেে জন্য ২ থেকে ৩ হাজার টাকা করে দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা না দিলে আবেদনটি বাতিল করে এসিল্যান্ড অফিসে প্রস্তাব পাঠিয়ে দেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এসিল্যান্ড অফিসে আসা অনেক ভূক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, নামজারি, মিসকেইস, লীজ নবায়ন সংক্রান্ত কাজ করতে দিয়ে আমাদেরকে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে নামজারিতে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝামেলা সৃষ্টি দেখান হয়।
অথচ এসিল্যান্ড অফিসের যোগ সাজশে একটি শক্তিশালী ভূমি সিন্ডিকেট মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সামান্য কয়েক দিনের মধ্যে তাদের কাজ হাসিল করে নিয়ে যাচ্ছে। কানুনগো ও সার্ভেয়ার নিজেদের আসল দায়িত্ব পালন না করায় কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) ভূমি অফিস ঘুরে দেখাগেছে, সার্ভেয়ার ও কানুনগোর টেবিলে নামজারি মামলার ফাইলের স্তপ জমে আছে। ভূমি সংস্কার বোর্ডের ১৯৯০ সালের ১৮ এপ্রিল জারিকরা এক পরিপত্র সূত্রে জানাযায়, কানুনগোর দায়িত্ব হলো উপজেলার বিভিন্ন তহশিল অফিস গুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন করে তাদের আদায় ও জমা পরীক্ষা করা। এসিল্যান্ডের নির্দেশে যাবতীয় তদন্ত কাজ সমাপ্ত করা। ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায় সংক্রান্ত রেজিষ্ট্রার ৩,৪,ও ৫ মিলিয়ে দেখা। একই সঙ্গে প্রতিটি দাখিলা বই (খাজনার রসিদ বই) ও পর্যায় ক্রমে রেজিষ্ট্রার-২ এর এন্টি পরীক্ষা করা। তা ছাড়া তহশিল অফিসের বকেয়া তালিকা, বার্ষিক জার, বার্ষিক রির্টান ও পয়স্তি-শিকস্তি নিরিক্ষা করনের কাজ করে কানুনগো। আর সার্ভেয়ারের কাজ হলো, সরকারি ভূমির খোজ-খবর রেখে এর বিবরনি তৈরী করা। কোন জমি বেদখল হলে তা মাপযোপ করে দখলে আনা।
এছাড়া এ্যাসিল্যান্ডের নির্দেশে কানুনগো স্কেপনকশা তৈরী কিংবা জমির দাগ ভাঙ্গানোর মাধ্যমে ভূমির বিরোধ নিস্পত্তি করার কাজও করে থাকেন। ভূমি ব্যবস্থাাপনা ম্যাানুয়েল কিংবা ভূমি প্রশাসনের ডিউটি চার্টারের কোথাও নামজারি করার ক্ষেত্রে কানুনগো ও সার্ভেয়ার কিংবা নামজরি সহকারীর কোন ভূমিকার কথা বলা নেই। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে ডুপ্লিকেট কার্বন কপি (ডিসিআার) কাঁটতে ১১৫০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও উপজেলা সহকারী কমিশনার অফিসে (ডিসিআর) কাটতে ১৫’শ থেকে ২ হাজার টাকা দিতে হয়। কানুনগো ও সার্ভেয়ারকে শুধু নামজারি ও মিসকেইস নিয়েই ব্যস্ত থাকেতে দেখা যায়। এতে দাপ্তরিক কাজে দীর্ঘ সূত্রতা ও জটিলতা সৃষ্টি হয়। সহকারী বিভিন্ন এসিল্যান্ড অফিস সূত্রে জানা গেছে, অফিসে নামজারী সহকারী নামে কোন পদ নেই। যেসব অফিস সহকারী নামজারি ফাইল রক্ষনাবেক্ষন করে এসিল্যান্ডের কাছে উপস্থাপন করেন, তাদের পদবী কাকতালিয়ভাবে সহকারী হয়ে গেছে। এ কাজে নামজারি সহকারী সার্ভেয়ার ও কানুনগোর মতামত আর সিলমোহর স্বাক্ষর বাধ্যতা মূলক করা হয়েছে। বিশ^স্ত সূত্রে জানাগেছে, গড়ে প্রতিটি নামজারি মালায় ৫/১০ হাজার টাকা ও মিসকেইস সংক্রান্ত মামলায় গড়ে প্রতিটি ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কানুনগো ও সার্ভেয়ারের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। যার একটি অংশ কানুনগো, সার্ভেয়ার ও সহকারীরা ভাগ ভাটোয়ারা করে থাকেন। এতে ভূমির প্রকৃত মালিকেরা তাদের কাঙ্খিত সেবা হতে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে সচেতন মহল মনে করেন। এসিল্যান্ড অফিসের বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে শ্রীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি গোলাম রাব্বি সোহেলের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
মন্তব্য করুন: