প্রকাশিত:
১৩ অক্টোবর ২০২৫, ১৪:৫২
দক্ষিণ আফ্রিকান স্পিনে মাত্র ১৬ রানে শেষ পাঁচ উইকেট খোয়ালেও ইমাম-উল-হক, শান মাসুদ, মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আলী আগার সেঞ্চুরি মিস করা ফিফটিতে চড়ে লাহোর টেস্টে এখন পর্যন্ত স্বস্তিতেই রয়েছে স্বাগতিক পাকিস্তান।
কারণ ইতোমধ্যেই যথেষ্ট টার্ন লক্ষ্য করা গেছে লাহোরের উইকেটে। যে ভেল্কি দেখিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার তিন স্পিনারের মধ্যে সেনুরান মুথুসামী একাই তো নিলেন ৬ উইকেট। বাকি দুজনের মধ্যে প্রেনেলান সুব্রায়েন ২টি ও সায়মন হারমার নিলেন ১ উইকেট। বাকি উইকেটটি গেছে পেসার কাগিসো রাবাদার পকেটে।
এর আগে রোববার লাহোরে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের উদ্বোধনী দিনে পাকিস্তানের ব্যাটিং ছিল দৃঢ় ও শৃঙ্খলাপূর্ণ। ইমাম-উল-হক ও শান মাসুদের ১৬১ রানের দ্বিতীয় উইকেট জুটি এবং পরে মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আগার অপরাজিত ১১৪ রানের ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে ৫ উইকেটে ৩১৩ রান জড়ো হলে দিনটি পাকিস্তানের নামে লেখা হয়ে যায়।
যদিও দ্বিতীয় দিনে লাঞ্চের আধাঘণ্টা আগেই বাকি পাঁচ উইকেটও হারিয়ে ফেলে স্বাগতিকরা। কেউ সেঞ্চুরি না পেলেও খুব কাছে গিয়ে আউট হন ইমাম-উল-হক ও সালমান আলী আগা। দুজনেই সাজঘরে ফেরেন সমান ৯৩ রান করে। অন্যদিকে ৭৬ ও ৭৫ রান করে আউট হন অধিনায়ক শান মাসুদ ও মোহাম্মদ রিজওয়ান।
উইকেটের ধরণ দেখে প্রথম ইনিংসে বড় রানই ছিল মূল লক্ষ্য, কারণ প্রথম দিন থেকেই বল টার্ন করতে শুরু করে। এতে হয়তো প্রোটিয়া ব্যাটাররা উদ্বিগ্নই হবেন— কেননা পিচে যথেষ্ট টার্ন আছে এবং পাকিস্তানি বোলাররা এর ফায়দা নেবে নিশ্চিত। তার ওপর প্রোটিয়াদের স্পিন ভীতি তো রয়েছেই।
এর আগে চারটি সহজ ক্যাচ ফেলে দিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকা কার্যত প্রথম দিনটি পাকিস্তানকে উপহার দেয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা জানত, সাবকন্টিনেন্টের পরিবেশ তাদের জন্য কঠিন হবে। তাই তারা তিন স্পিনার ও দুই পেসার নিয়ে মাঠে নামে। কিন্তু তাদের এই স্পিন আক্রমণ ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনভিজ্ঞ— সেনুরান মুথুসামী, সায়মন হারমার ও প্রেনেলান সুব্রায়েন মিলে মোট ১৬টি টেস্ট খেলেছেন, যদিও প্রথম শ্রেণিতে উইকেট তাদের ৪২২টি। তবে বলের টার্ন প্রমাণ করে দিয়েছে— পরের দিনগুলোয় ব্যাটিং আরও কঠিন হতে চলেছে। মুথুসামী তো ৬ উইকেটই ঝুলিতে পুরেছেন।
এর আগে, টস জিতে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তানকে শুরুতেই নাড়া দেন কাগিসো রাবাদা। তার তৃতীয় বলেই আবদুল্লাহ শফিক এলবিডব্লিউ হন, রিভিউ নিয়ে আউট নিশ্চিত করেন অধিনায়ক এইডেন মার্করাম। এরপরই শান মাসুদ রাবাদাকে টানা দুই বাউন্ডারি মেরে পাল্টা জবাব দেন। দুই ওভার বল করেই পেসার মুল্ডারকে সরিয়ে দেন মার্করাম, স্পিন আক্রমণে আনা হয়। মাসুদ তখনই সুব্রায়েনকে সোজা মাথার ওপর দিয়ে ছক্কা মারেন।
ইমাম শুরু থেকেই নিখুঁত টাইমিংয়ে খেলছিলেন, লুজ ডেলিভারিগুলো কাজে লাগাচ্ছিলেন। ৬৫ বলে হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করে স্পিনারদের প্রভাব নস্যাৎ করে দেন। রাবাদার স্পেলেও একবার এলবিডব্লিউর আবেদনে বেঁচে যান— বল প্যাডে লাগলেও ইমপ্যাক্ট ছিল অফ স্টাম্পের বাইরে।
দ্বিতীয় সেশনে শান মাসুদ হাফসেঞ্চুরি করেন হারমারকে মিড-অন দিয়ে ড্রাইভ মেরে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা কিছু সুযোগ তৈরি করে। ৬১ রানে থাকা মাসুদ একবার সুব্রায়েনের বলে শর্ট লেগে ক্যাচ দেন, কিন্তু টনি ডি জরজি সেটি হাতছাড়া করেন। পরের ওভারে ইমামও সুব্রায়েনকে মিড-অফে তুলে দেন, কিন্তু মুল্ডার সেটিও ফেলে দেন। অবশেষে সুব্রায়েন মাসুদকে এলবিডব্লিউ করেন— এবার বল আর ঘোরেনি, তবে ব্যাটার ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলেন।
৭৬ রান করা মাসুদের বিদায়ের পর দর্শকরা আনন্দ ধ্বনির বন্যা বইয়ে দেন— কারণ মাঠে নামেন বাবর আজম। কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ টেকেনি। মুথুসামীর বলে ক্যাচ আউটের আবেদনে সাড়া দিয়ে আম্পায়ার বাবরকে আউট দেন, যদিও রিভিউ নিয়ে এ যাত্রায় বেঁচে যান তিনি। এরপর দুটো বাউন্ডারিতে ফর্মে ফেরেন বাবর। তবে মুথুসামীর আগুনঝরা স্পেলে পাকিস্তান ধসে পড়ে— মাত্র ৭ রানের আক্ষেপে পুড়িয়ে শর্ট লেগে ক্যাচ দেন ইমাম। সৌদ শাকিলও মুথুসামীর হাতে ক্যাচ তুলে দেন। এতে চা-বিরতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান কিছুটা শক্ত হয়।
চা-বিরতির পর হারমারের বলে বাবর (৩১) এলবিডব্লিউ হন, রিভিউতে দেখা যায় বল লেগ স্টাম্পে লাগত— ফলে সিদ্ধান্ত টিকে যায়।
পাকিস্তান তখন বেশ চাপে, কিন্তু মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সালমান আগা চতুরতার সঙ্গে মোড় ঘুরিয়ে দেন। রিজওয়ান মুথুসামীকে ছক্কা মারেন, হারমারকে কভারে বাউন্ডারি মারেন। অন্যদিকে আগা শুরুতে রক্ষণাত্মক খেললেও পরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। এক পর্যায়ে তার রিভার্স-সুইপে বল উইকেটরক্ষকের হাতে গেলেও রিপ্লেতে দেখা যায় বল মাটিতে পড়েছিল।
রিজওয়ানও ভাগ্যবান— একবার মার্করাম স্লিপে লো ক্যাচ ধরেছিলেন মনে করলেও রিপ্লেতে দেখা যায় বল বাউন্স করেছে। আরেকবার এলবিডব্লিউ দিলেও রিভিউতে দেখা যায় বল লেগ স্টাম্প মিস করছে।
দ্বিতীয় নতুন বল নিতেই রিজওয়ান হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। এরপর আগাও হাফসেঞ্চুরি তুলে পাকিস্তানকে দিনশেষে ৩১৩/৫-এ নিয়ে যান। দুইজনই অপরাজিত থেকে ড্রেসিংরুমে ফেরেন— দিনটি পাকিস্তানের নামে লিখে দেন।
যদিও দ্বিতীয় দিনে ব্যাটিংয়ে নেমে খেই হারিয়ে ফেলে স্বাগতিকরা। এদিন আর মাত্র ৬৫ রান যোগ করতে পারে তারা, যার মধ্যে মাত্র ১৬ রানে পড়ে যায় শেষ পাঁচ উইকেট। মুথুসামী ১১৭ রানের বিনিময়ে একাই নেন ৬ উইকেট।
তবুও বলা যায় পাকিস্তান ব্যাটিংয়ে দৃঢ়তা দেখিয়েছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাচ মিসগুলোই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছে। পাশাপাশি স্পিনাররা বেশ টার্ন পাচ্ছেন— যা পরের দিনগুলোতে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। আর সেটাই হতে পারে এই টেস্টের নির্ধারক ফ্যাক্টর।
মন্তব্য করুন: