প্রকাশিত:
২২ অক্টোবর ২০২৫, ১৬:১৬
বর্তমানে সারাদেশে শিশুদের টাইফয়েড রোগ প্রতিরোধের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান ক্যাম্পেইন চলছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫ কোটি শিশুকে এই জীবনদায়ী টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কিছু মহল এই টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে ভিত্তিহীন ও ক্ষতিকর গুজব ছড়াচ্ছে। কিন্তু এই টিকা অত্যন্ত নিরাপদ এবং শিশুদের জন্য এর উপকারিতা অনস্বীকার্য।
মঙ্গলবার দুপুরে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, চট্টগ্রাম মা-শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিশু তালুকদার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, টাইফয়েড জ্বর একটি গুরুতর রোগ যা ‘সালমোনেলা টাইপি’ নামক ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে এই রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, যেখানে স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির সমস্যা প্রকট, সেখানে টাইফয়েড শিশুদের জন্য এক নীরব ঘাতক।
টাইফয়েড কেন শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী
১. তীব্র অসুস্থতা: টাইফয়েড হলে শিশুর উচ্চ জ্বর, পেটে ব্যথা, বমি, দুর্বলতা এবং কখনো কখনো ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়। এই জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
২. মারাত্মক জটিলতা: সময়মতো চিকিৎসা না হলে বা রোগ গুরুতর হলে অন্ত্রে রক্তক্ষরণ, অন্ত্রে ফুটো (পারপুরেশন) এবং মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সংক্রমণ (মেনিনজাইটিস ইভি এনকেপালোপ্যাথি) হতে পারে, যা শিশুর জীবন কেড়ে নিতে পারে।
৩. অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স) টাইফয়েড: বর্তমানে মাল্টি-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (এমডিআর) ও এক্সটেনসিভলি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট (এক্সডিআর) টাইফয়েডের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকও অনেক সময় কাজ করে না। এই অবস্থায় টিকা দেওয়া ছাড়া প্রতিরোধের আর কোনো বিকল্প থাকে না।
যে টিকাটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কতটা নিরাপদ ?
বর্তমানে ঊচও কর্মসূচিতে যে টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) ব্যবহার করা হচ্ছে, তা বহুবিধ মানদন্ডে পরীক্ষিত এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ।
১. ডব্লিউএইচও কোয়ালিফায়েড: টিকাটি জিএসকে (জিএসকে) ফর্মুলায় প্রস্তুতকৃত এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কর্তৃক গুণগত মান ও কার্যকারিতার ভিত্তিতে অনুমোদিত।
২. বহুল ব্যবহৃত ও প্রমাণিত: বিশ্বব্যাপী এই ধরনের টিকা বহু বছর ধরে কোটি কোটি শিশুকে দেওয়া হচ্ছে এবং এর নিরাপত্তা প্রোফাইল অত্যন্ত চমৎকার।
৩. আইসিডিডিআর,বি গবেষণা: আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর মতো বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই টিকার নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা করেছে এবং তাদের ফলাফলে এটি শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে। এই গবেষণালব্ধ ফলাফল আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এর নির্ভরযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
৪. সুবিধাজনক টিকা: টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) অন্যান্য পুরোনো টাইফয়েড টিকার চেয়ে বেশি কার্যকর এবং এটি ৯ মাস বয়স থেকেই দেওয়া যায়। এটি মাত্র এক ডোজেই দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
ডা. মিশু তালুকদার বলেন, গুজবে কান নয়, বিজ্ঞান ও বিশ্বাসে আস্থা রাখুন। গুজবে বলা হচ্ছে যে এই টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মারাত্মক বা এটি অন্য কোনো ক্ষতি করবে-এই ধরনের প্রচার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। অন্য যে কোনো টিকার মতো এই টিকারও কিছু সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, যেমন: টিকা দেওয়ার স্থানে সামান্য ব্যথা, ফোলা বা জ্বর। এগুলো সাধারণত ১-২ দিনের মধ্যে এমনিতেই সেরে যায় এবং তা টাইফয়েড রোগের মারাত্মক জটিলতার তুলনায় কিছুই নয়। সরকার যখন কোটি কোটি শিশুর জীবন রক্ষায় এমন একটি মহৎ উদ্যোগ নিয়েছে, তখন আমাদের সবার উচিত তাকে সমর্থন করা। আপনার শিশুকে এই টিকা দিয়ে আপনি শুধু আপনার সন্তানকেই নয়, বরং সমাজকেও সুরক্ষিত করছেন, কারণ একজন টিকা নেওয়া শিশু রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি অনেক কমিয়ে দেয়।
আসুন, আমরা সবাই দায়িত্বশীল হই। গুজবে কান না দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া তথ্যে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর আস্থা রাখি। আজই আপনার ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুকে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যান এবং টাইফয়েড নামক নীরব ঘাতক থেকে সুরক্ষিত করুন। আপনার শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই আমাদের সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
সব শিশুকেই টাইফয়েড টীকা দিন, যদি আগে কোনোভাবে টাইফয়েড টিকা বাচ্চাকে দিয়ে থাকেন,তাহলে শিশুকে টাইফয়েড টীকাটি দিতে পারবেন। তাহলে আর কি, বাচ্চাকে আজই টিকা দান কেন্দ্রে নিয়ে যান। নির্ভয়ে টিকা দিয়ে আসুন। মনে রাখুন। আজকের রোগমুক্ত শিশু ভবিষ্যতের সম্পদ।
মন্তব্য করুন: