শনিবার, ৭ই মার্চ ২০২৬, ২৩শে ফাল্গুন ১৪৩২ | ই-পেপার
ব্রেকিং নিউজ:
  • সারাদেশে উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আগ্রহী হলে আপনার সিভি ই-মেইল করতে পারেন। ই-মেইল nagorikdesk@gmail.com
সংবাদ শিরোনাম:
  • দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে ইরানই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে: বিশ্লেষক
  • ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ চলমান রাখার বার্তা গভর্নরের
  • ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলায় ইরানে নিহত বেড়ে ৫৫৫
  • আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব তলব
  • অপরাধ দমনে আরও বেশি সক্রিয় পুলিশ
  • ঢাকার আইসিইউয়ে ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক ‘সুপারবাগ’ ছড়িয়ে পড়েছে
  • ভূমি প্রতিমন্ত্রী অফিসে গিয়ে দেখেন কর্মকর্তারা কেউ আসেননি
  • রাজধানীতে নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
  • আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে খামেনিকে হত্যা, বিবৃতিতে বাংলাদেশ
  • মঙ্গলবার থেকে মিলবে ঈদযাত্রায় ট্রেনের টিকিট

মানবতার মাহাত্ম্য মানবিকতায়

রেহানা ফেরদৌসী

প্রকাশিত:
২৯ অক্টোবর ২০২৫, ১৭:১৪

‘যান্ত্রিক জীবনের শহর' ঢাকা। বড়বড় অট্টালিকা ভিড়ে এ শহরে অগণিত মানুষকে পড়ে থাকতে হয় ফুটপাতে। শহরের এক প্রান্তে যখন চলে জমজমাট খাওয়াদাওয়া আর বুফের আয়োজন, তখন অন্য প্রান্তে কিছু মানুষ একবেলা আহার জোগাড়ের জন্য জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত। শহরের হাজার হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত লড়ে যান অস্তিত্ব টিকে রাখার এ যুদ্ধে । দিনমজুর থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ, সবার সংগ্রাম যেন একটাই তিনবেলা পেটভরে খাবার খাওয়া। কিন্তু কোথায় মিলবে খাবার!

রাজধানীতে খুঁজলে সন্ধান পাওয়া যায় এমন কিছু মানুষ, সংগঠন আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, যেগুলো প্রান্তিক এ মানুষগুলোর টিকে থাকার যুদ্ধে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় প্রতিনিয়ত। তারা পালন করে মানুষের ক্ষুধা নিবারণের মহান ব্রত। প্রতিদিন শতশত মানুষ ভালো কিছু খাবারের আশায় ভিড় করেন এমনই বেশ কিছু জায়গায়। কারওয়ান বাজার মোড়ের পাশে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট রোড এ আসলেই চোখে পড়বে একটি রঙিন দেওয়াল, যাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা 'ভালো কাজের হোটেল'। এর কাছেই, সাতরাস্তার মোড়ে রয়েছে এমন আরও একটি দেয়াল। এ দেওয়ালগুলো আসলে একটি হোটেল, যেখানে সপ্তাহে সাতদিন মানুষকে বিনামূল্যে খাবারের আয়োজন করে 'ইয়ুথ ফর বাংলাদেশ'। দিনে একটি অন্তত ভালো কাজ করলেই এখানে খাবার খেতে পারেন যে কেউ।

সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক ফারহান রহমান জানালেন, ২০১৯ এর ডিসেম্বর থেকে 'ভালো কাজের হোটেল' পরিচালনা করে আসছে তাদের এ সংগঠনটি। “ভালো কাজের হোটেল" এর উৎপত্তি ইয়ুথ ফর বাংলাদেশ থেকে, যা ২০০৯ সালে আরিফুর রহমান এবং তার বন্ধুদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি যুব-নেতৃত্বাধীন স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন। এই দলটি প্রথমে সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য তহবিল সংগ্রহের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল কিন্তু ধীরে ধীরে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা সহ বৃহত্তর সামাজিক সমস্যা মোকাবেলায় তার কার্যক্রম প্রসারিত করে। ধীরে ধীরে ২০০৯ সালে "ভালো কাজের হোটেল" চালু করার মাধ্যমে রূপ নেয়, যার লক্ষ্য ছিল খাদ্যের মাধ্যমে নৈতিক আচরণ প্রচার করা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা পুরস্কৃত করা। এটি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সদস্যপদ ১,৭০০ নিবন্ধিত সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবক ৪৫০০ জন।

ইয়ুথ ফর বাংলাদেশের শুরুর দিকের আরেকজন শিহানুর রহমান। পেশায় স্থপতি তিনি। তবে সময় পেলেই ছুটে আসেন খাবার বিতরণে। এই কার্যক্রম পরিচালনা করে “ডেইলি টেন মেম্বার”। রোজ যারা সংগঠনের তহবিলে ১০ টাকা করে জমা দেন, তাঁরাই এই বিশেষ সদস্য। তাঁদের সংগঠনের ফেসবুক গ্রুপে কয়েক হাজার মানুষ যুক্ত থাকলেও রোজ ১০ টাকা দেন, এমন সদস্য আছেন ২৬৫ জন, যাঁদের সহায়তায় পরিচালিত হয় ‘ভালো কাজের বিনিময়ে আহার’। চাঁদা থেকে মাসিক প্রায় ৮০ হাজার টাকা সংগৃহীত হয়। সে টাকায় ২০ দিন খাওয়াতে পারেন তাঁরা। আবার সদস্যদের অনেকেই ব্যাক্তিগত পর্যায়ে উদ্যোগী হয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেন। শুভাকাক্সক্ষী আর সদস্যদের মাসিক চাঁদা দিয়ে চলে সমস্ত কার্যক্রম।

ফারহানা রহমান, আরিফুর রহমান, শিহানুর রহমান, আশিকুর রহমান, তামিম চৌধুরী, রাজীব সরকার, মো. মাহবুব, মো. সোহেল, মো. ফয়সাল, শাওন রহমান, মনিরুজ্জামান এর মতো সেচ্ছাসেবকরা এই দলে আছেন। তাঁরাই এগিয়ে নিচ্ছেন কার্যক্রম। বন্যার্তদের পাশে ত্রাণ নিয়ে ছুটে যাওয়া, অসহায়দের জন্য চিকিৎসাসেবা, শীতার্তদের শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানা সামাজিক কাজে যুক্ত আছেন এই তরুণেরা।

ঢাকা শহরে মোট ১০ জায়গায় এ আয়োজন হয়। দুপুরে মিরপুর, কালশী, সাতরাস্তা, কারওয়ান বাজার, ওয়ারী এবং বনানী কড়াইল বস্তিতে, আর রাতে বাসাবো, কমলাপুর, মোহম্মাদপুর, ধানমন্ডিতে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও এ হোটেল পরিচালিত হয়। প্রতিদিন প্রায় শতাধিক মানুষ খাবার খেয়ে থাকেন। দুপুর ১২ টার আগে থেকেই জড়ো হতে থাকেন সবাই। খাবার আসে ঠিক ১টায়। এখানে খেয়ে স্বস্তির দিন কাটে অনেক অসহায় মানুষের।

শনি থেকে বৃহস্পতিবার অসহায় মানুষকে অন্তত একটি ভালো কাজের বিনিময়ে খাবারের ব্যবস্থা করেন। শনিবারে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলে এ কার্যক্রম। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে বেলা দেড়টা থেকে তিনটা পর্যন্ত। শুক্রবার তাঁরা খাবার নিয়ে ছোটেন রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ ও এতিমখানায়। মসজিদের সামনে আসা নিম্ন আয়ের মানুষদের হাতে যেমন খাবার তুলে দেন, তেমনি এতিমখানায় গিয়ে এতিমদের খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেন। এভাবে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে খাওয়ান। এই স্বেচ্ছাকর্মীরা, করোনাকালে কর্মহীন মানুষদের কষ্ট দেখে তাদের সাহায্য আরো বাড়িয়ে দেন, যা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে নিয়মিত।

এটি ছাড়াও বেশ কয়েকটি সংগঠন ও ব্যক্তি নামে-বেনামে খাবার বিতরণ করেন ঢাকায়। এর মধ্যে অন্যতম 'ভালো কাজের হোটেল'। রিকশাওয়ালা-কুলি থেকে শুরু করে নিম্ন আয়ের সব মানুষই এখানে খাবার খেয়ে থাকেন। মানুষের প্রতি মানুষের এ সৌহার্দ্য টিকে থাকুক। “ভালো কাজের হোটেল” এর জন্য শুভকামনা রইলো। সফলতার সাথে প্রসারিত হোক এই তরুণ দলের মানবিক কার্যক্রম। ক্ষুধা প্রতিটি জীবনের একটি সর্বজনীন অনুভূতি।

আসুন, ভালোবাসা ছড়িয়ে দেই। মানবতার জয় হোক, দূর হোক সকল বিভেদ।

 

রেহানা ফেরদৌসী, সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (কেন্দ্রীয় পুনাক) মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

 

 

 

 

 

 

 


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর