প্রকাশিত:
২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬:২৩
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রায় বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেত শিল্প। বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যের কদর এখন আর নেই বললেই চলে। এক সময় গ্রামীণ জনপদের মানুষ গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহার করত বাঁশ ও বেতের তৈরী বিভিন্ন তৈজসপত্র। এমন কি বিভিন্ন অফিস-আদালতেও দেখা মিলত বাঁশ ও বেত সামগ্রীর ব্যবহার।
এক সময় প্রায় প্রতিটি কৃষকের ঘরে দেখা যেত বাঁশ ও বেতের তৈরি লাই, খাঁচা, মইসহ বিভিন্ন পণ্য। ঘর-বাড়ি, অফিস- আদালতে দেখা যেত রকমারি ফুলদানি, ঝুঁড়ি, বিউটি বক্স, কসমেটিক্স বক্স, বিয়ের ঢালা, কুলা, কলমদানি, চেয়ার, বই- শেলফসহ বিভিন্ন নান্দনিক ও টেকসই বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যের সমাহার। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেসব পণ্যের জায়গা দখল করে নিয়েছে স্বল্প দামের প্লাস্টিক ও লৌহজাত সামগ্রী।
বাঁশ ও বেত সামগ্রীর প্রসার কমে যাওয়ায় ভালো নেই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা। তবুও বাপ-দাদার এই পেশাকে এখনও ধরে রেখেছে কিছু সংখ্যক পরিবার। দিন দিন বিভিন্ন জিনিস-পত্রের মূল্য বাড়লেও তুলনা দিয়ে বাড়েনি এই শিল্পের কদর বা মূল্য। যার ফলে কারিগররা জীবন সংসারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্লাস্টিক ও লৌহজাত সামগ্রীর কদর বেড়ে যাওয়ায় বাঁশ ও বেতের সেই ঐতিহ্যবাহী কুঁটির শিল্পের চাহিদা এখন আর তেমন নেই। তাছাড়া এ শিল্পের কাঁচামাল, বাঁশ ও বেত এখন আর সহজলভ্যও নয়। উপজেলা সদর বিবিরহাটে বসে প্রাচীন এই তৈজসপত্রের হাট। এই হাটে গেলে চোখে পড়বে হাতের তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্রের পসরা। উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে কারিগররা তাদের তৈরিকৃত পণ্য নিয়ে সপ্তাহের দুইদিন আসেন এই হাটে। তাছাড়া সপ্তাহের বাকি দিন গুলোতে বেত- বাঁশের বিভিন্ন পণ্য এই হাটের মাত্র কয়েকটি স্থায়ী দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেপারিরা আসেন এ হাটে। পাইকারিতে এসব পণ্য ক্রয় করে জেলাসহ দেশের বিভিন্ন হাট বাজারে নিয়ে বিক্রি করে। বেশ্ চাহিদাও রয়েছে এ অঞ্চলের এসব তৈজসপত্রের।
বাঁশ ও বেতের তৈরি লাই, খাঁচা, মইসহ বিভিন্ন তৈজসপত্রের পসরা নিয়ে বাজারে আসা কারিগর নুরুল আলম বলেন, আমরা নিজেরাই বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন পণ্য পাড়া- মহল্লায় বিক্রি করতে যেতাম। এখন পাড়া মহল্লায় তেমন বেচা-বিক্রি হয় না। তাই হাটে নিয়ে আসি। এটা আমাদের আদি পেশা। এখন আগের মতো এ পেশায় লাভ নেই। তবুও বাপ -দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখতে এ পেশা ধরে রেখেছি। বাঁশের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন টিকে থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। লাভ কম হলেও এ পেশা নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই।
উপজেলার ভূজপুর থানা এলাকার পশ্চিম ভূজপুর গ্রামের কারিগর আহাম্মদ মিয়া বলেন, বর্তমানে হাতের কাছে স্বল্প দামে প্লাস্টিক সামগ্রী পাওয়া যায়। তাই আমাদের এই শিল্পের চাহিদা এখন তেমন নেই। তাছাড়া দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে এ শিল্পের কাঁচামাল বাঁশ ও বেত। এক সময় ১টি বাঁশ কিনতে পাওয়া যেত ৬০/৭০ টাকায়। এখন সে বাঁশের দাম দেড়’শ টাকার উপরে। সে হিসেবে আমাদের তৈরি এসব জিনিস পত্রের দাম বাড়েনি। তাছাড়া বেত পাওয়া বড়ই মুশকিল। এক সময় মানুষ বেতের চাষ করত, এখন আর আগের মত বেতের চাষ হয় না। একটি লাই বা খাঁচা তৈরি করতে মজুরী বাদে ৩০ থেকে ৪০ টাকা খরচ হয়। তার উপর মজুরী, কিন্তু বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। একজন মানুষ সারা দিন কাজ করলে ৩/৪টি লাই বানাতে পরে। সেই হিসেবে আমাদের তেমন পোষায় না। কৃষি কাজে ব্যবহৃত কিছু পণ্যের চাহিদা এখনও আছে বলে আমরা টিকে আছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, হস্ত শিল্পে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে আমরা গত কিছুদিন আগে একটা মেলার আয়োজন করেছি। নতুন করে বিভিন্ন সরকারী আশ্রয়ণ কেন্দ্র গুলোতে হস্ত শিল্পের উপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। মৃৎ শিল্প, বেত-বাঁশ শিল্প, সর্বোপরি কুঁটির শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
মন্তব্য করুন: