প্রকাশিত:
২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১৫:৫৮
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (আইইপিএমপি ২০২৫) অনুমোদনের উদ্যোগ বাতিলের দাবিতে নেত্রকোনায় নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি সংগঠন এক প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬–২০৫০) গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি প্রণয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও সমাজের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি এবং জনগণের অংশগ্রহণ উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি জানান তারা।
এ সময় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ওয়াচ নেত্রকোনার নির্বাহী পরিচালক জামাল উদ্দিন খান, পল্লী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সুমন খান, ফোরাম অন ইকোনমিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নেত্রকোনার যোগাযোগ ও গণমাধ্যম সম্পাদক মেহেদী হাসান আকন্দ, এইচআরএফবির চেয়ারম্যান দিলওয়ার খানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
শনিবার সকাল ১০টায় বাংলাদেশ পরিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউইডব্লিউজি)-এর উদ্যোগে এবং অন্যচিত্র ফাউন্ডেশন, পরিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম–নেত্রকোনা ও উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)-এর সহ-আয়োজনে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অন্যচিত্র ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক রেবেকা সুলতানা বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬–২০৫০) প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনসম্পৃক্ততা, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। জনশুনানি ও স্বচ্ছ পরামর্শ ছাড়াই এই পরিকল্পনা অনুমোদনের চেষ্টা পূর্ববর্তী সরকারের অস্বচ্ছ ও কর্তৃত্ববাদী নীতিনির্ধারণের পুনরাবৃত্তি মাত্র।”
বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল কেবল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু তারা সেই সীমা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন জ্বালানি পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
তারা আরও বলেন, অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ব্যবহার করে যেভাবে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, আইইপিএমপি ২০২৫ সেই একই পথে ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে।
মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’ ধারণার ব্যাপক প্রচার থাকলেও বাস্তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত অংশ মাত্র ১৭ শতাংশ, যেখানে কাগজে ৪৪ শতাংশ দেখানো হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫ দশমিক ৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫ দশমিক ২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ বছর পরও এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা থাকবে প্রায় ৫০ শতাংশ, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
বক্তারা বলেন, হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ (সিসিএস)-এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয় এবং ভবিষ্যতে দেশকে নতুন ঋণ, ভর্তুকি ও পরিবেশগত সংকটে ফেলতে পারে।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ হবে ১৮৬ দশমিক ৩ মেট্রিক টন CO₂e, যা দেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) লক্ষ্য এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
এছাড়া শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায়বিচার, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পোশাক খাতের সবুজায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিকল্পনায় প্রায় উপেক্ষিত রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বক্তারা।
প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে জোরালোভাবে চার দফা দাবি জানানো হয়—
অবিলম্বে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (আইইপিএমপি ২০২৫) স্থগিত ও সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করতে হবে।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে বাস্তবসম্মত শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
ন্যায্য, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অন্যথায়, খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি জনবিরোধী, অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নথি হিসেবে পরিগণিত হবে, যা দেশের জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা।
মন্তব্য করুন: